ইলিশ কাটার সঠিক নিয়ম: মাথা, মুক্তা আর দেহ
ইলিশ কাটার সময় ধারালো ছুরি, মাছের গঠন এবং অংশভেদে ব্যবহারের বিষয়টি বুঝে কাজ করা জরুরি। ভুলভাবে কাটলে মাথার মাংস নষ্ট হয়, পেটের ডিম ছড়িয়ে যেতে পারে এবং দেহের পেটি ও গাদার টুকরো অসমান হয়ে রান্নার স্বাদ কমে যায়।
তাজা ইলিশ সাধারণত আঁশটে গন্ধহীন, চোখ উজ্জ্বল এবং শরীর শক্ত থাকে। ৭০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি বা তার বেশি ওজনের মাছ কাটার পদ্ধতিতে সামান্য পার্থক্য থাকলেও মাথা, মুক্তা, পেটি, গাদা ও লেজ আলাদা করার মূল নিয়ম একই।
মাছ বাছাই ও কাটার প্রস্তুতি
কাটার আগে মাছটি পরিষ্কার পানিতে হালকা ধুয়ে নিন। বেশি সময় পানিতে ভিজিয়ে রাখবেন না, কারণ এতে ইলিশের স্বাভাবিক তেল ও গন্ধ কমে যেতে পারে। একটি বড় কাঠের বা প্লাস্টিকের কাটিং বোর্ড ব্যবহার করলে মাছ স্থির থাকে এবং ছুরি চালানো সহজ হয়।
ছুরিটি মাঝারি লম্বা, ধারালো ও শক্ত হওয়া ভালো। ভোঁতা ছুরি দিয়ে চাপ প্রয়োগ করলে মাছের চামড়া ছিঁড়ে যায় এবং পেটের অংশ ভেঙে যেতে পারে। হাত শুকনো রাখুন, বোর্ডের নিচে ভেজা কাপড় দিন এবং মাছের পিছলভাব কমাতে পরিষ্কার কাপড় ব্যবহার করুন।
কাটার আগে দ্রুত যাচাই
মাছ কাটার আগে কয়েকটি বিষয় পরীক্ষা করলে অংশগুলো সুন্দর থাকে এবং রান্নার উপযোগিতা বজায় থাকে।
- মাছের চোখ স্বচ্ছ ও উজ্জ্বল কি না দেখুন
- পেট নরম বা অস্বাভাবিকভাবে ফুলে আছে কি না দেখুন
- গিলের রং উজ্জ্বল লালচে কি না যাচাই করুন
- শরীরে অতিরিক্ত কালচে দাগ বা পচা গন্ধ আছে কি না পরীক্ষা করুন
বাজার থেকে পরিষ্কার করা ইলিশ এলে ভেতরের অংশ আলাদা করে দেখে নিন। পেটের কালচে আবরণ, রক্তের জমাট অংশ ও নাড়িভুঁড়ি সরিয়ে ফেলতে হবে, তবে ডিম বা মুক্তা থাকলে তা সাবধানে আলাদা পাত্রে রাখুন।
মাথা আলাদা করার নিয়ম
প্রথমে মাছের মাথার ঠিক পেছনে, গিলের শেষ প্রান্ত বরাবর ছুরি বসান। একবারে জোরে কাটার বদলে দুই দিক থেকে হালকা চাপ দিয়ে কাটলে মাথার মাংস কম নষ্ট হয়। মাথা আলাদা করার সময় পেটের দিকের নরম অংশে অতিরিক্ত চাপ দেবেন না।
ইলিশের মাথায় গাল, ঘাড় এবং কপালের কাছে সুস্বাদু মাংস থাকে। তাই মাথাকে মাঝ বরাবর ভেঙে বা কেটে দুটি অংশ করা যায়। মাথার কাঁটা শক্ত হওয়ায় ছুরি দিয়ে বারবার ঘষার বদলে ভারী বঁটি বা শক্ত ধারালো ছুরি ব্যবহার নিরাপদ।
মাথা দিয়ে পাতলা ঝোল, চচ্চড়ি বা ডাল রান্না করা যায়। মাথার ভেতরের রক্ত ও জমাট অংশ পরিষ্কার পানিতে একবার ধুয়ে নিলে ঝোলের স্বাদ পরিষ্কার থাকে।
মুক্তা বা ডিম আলাদা করা
ইলিশের পেটের ভেতরে ডিমের থলি থাকলে সেটিই অনেক পরিবারে মুক্তা নামে পরিচিত। অঞ্চলভেদে মুক্তা বলতে ডিম, নরম চর্বিযুক্ত অংশ বা ভেতরের বিশেষ অংশ বোঝানো হতে পারে। তাই কাটার সময় পেট বরাবর খুব গভীর ছুরি চালানো যাবে না।
মাথা আলাদা করার পর পেটের নিচে অল্প চেরা দিন এবং আঙুলের সাহায্যে ভেতরের থলি বের করুন। ছুরি দিয়ে টেনে বের করলে ডিম ছড়িয়ে যেতে পারে। ডিম অক্ষত থাকলে লবণ দিয়ে হালকা ধুয়ে পানি ঝরিয়ে আলাদা পাত্রে রাখুন।
মুক্তা রান্নার আগে অতিরিক্ত পানি ঝরিয়ে নিতে হয়। সরিষার তেল, কাঁচা মরিচ ও সামান্য লবণ দিয়ে ভাজা, অথবা ডিমসহ পেটির ঝোল—দুইভাবেই এটি ব্যবহার করা যায়। কাঁচা ডিম দীর্ঘ সময় ঘরের তাপমাত্রায় না রেখে দ্রুত রান্না বা ঠান্ডা সংরক্ষণ করা উচিত।
দেহকে পেটি ও গাদায় ভাগ করা
মাথা ও লেজ বাদ দেওয়ার পর দেহের অংশটি সমান প্রস্থে কাটুন। সাধারণত পেটের দিকের নরম ও তেলযুক্ত অংশকে পেটি এবং পিঠের তুলনামূলক শক্ত মাংসল অংশকে গাদা বলা হয়। মাঝারি ইলিশে পাঁচ থেকে সাতটি টুকরো করা যায়, তবে রান্নার ধরন অনুযায়ী আকার নির্ধারণ করুন।
সরিষা ইলিশের জন্য মাঝারি মোটা পেটি ভালো, কারণ এতে মসলা ঢোকে এবং রান্নার সময় টুকরো ভেঙে যায় না। ভাজার জন্য তুলনামূলক মোটা টুকরো রাখলে বাইরের অংশ শক্ত হলেও ভেতরটা নরম থাকে। লেজের কাছের অংশ ছোট হওয়ায় তা ঝোল বা ভর্তায় ব্যবহার করা সুবিধাজনক।
প্রতিটি টুকরো কাটার সময় কাঁটার রেখা লক্ষ্য করুন। বঁটির নিচে টুকরো রেখে একবারে সোজা চাপ দিন; সামনে-পেছনে ঘষলে কাঁটা চূর্ণ হয়ে মাংসে ছড়িয়ে পড়ে।
ধোয়া, লবণ দেওয়া ও সংরক্ষণ
ইলিশের টুকরো কাটার পর খুব বেশি পানি দিয়ে ধোবেন না। একবার পরিষ্কার পানি ঢেলে রক্ত ও ছোট কাঁটা সরিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ঝরনিতে রাখুন। দীর্ঘ সময় পানিতে রাখলে টুকরোর গঠন নরম হয়ে যায় এবং ভাজার সময় তেল ছিটাতে পারে।
রান্নার আগে হালকা লবণ ও হলুদ মাখানো যায়, তবে অনেকক্ষণ মেরিনেট করলে মাছের নিজস্ব স্বাদ চাপা পড়ে। রান্না বিলম্বিত হলে টুকরোগুলো শুকনো পাত্রে রেখে ঢেকে ফ্রিজে রাখুন। ডিম বা মুক্তা আলাদা প্যাকেটে রাখলে তা ভেঙে অন্য অংশে মিশে যাবে না।
অনলাইনে কেনা ইলিশের ক্ষেত্রে প্যাকেট খোলার পর ওজন, টুকরোর সংখ্যা এবং বরফ গলার পানি পরীক্ষা করুন। দ্রুত রান্না করতে চাইলে ইলিশের রেসিপি দেখে পেটি, মাথা ও ডিমের জন্য আলাদা রান্নার পদ্ধতি বেছে নেওয়া যায়।
কাটার ধরন অনুযায়ী রান্নার ব্যবহার
মাথা সাধারণত ডাল, লাউ বা কচুশাকের সঙ্গে ভালো মানায়। পেটির অংশ সরিষা, কাঁচা মরিচ ও সরিষার তেলে রান্না করলে ইলিশের তেল ও সুবাস সবচেয়ে ভালোভাবে ফুটে ওঠে। গাদার টুকরো ভাজা, ভর্তা বা পাতলা ঝোলে ব্যবহার করা যায়।
পাতলা ঝোলে মাছের টুকরো ছোট না করে মাঝারি আকারে রাখুন। এতে কাঁটা আলাদা করা সহজ হয় এবং রান্নার সময় মাংস ভেঙে যায় না। প্রচলিত স্বাদের একটি ব্যবহার দেখতে ঝোল রান্নার পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে।
ইলিশ কাটার সঙ্গে অনলাইন কেনাকাটার তথ্য পড়ার সময় একই সাইটের বিভিন্ন গাইডে বিষয়ভেদে আলাদা নির্দেশনা থাকতে পারে; খাদ্যবিষয়ক তথ্যের বাইরে নিউজিল্যান্ড বোনাস গাইড একটি ভিন্ন ধরনের অনলাইন পাঠ। আর তাজা মাছ ঘরে পৌঁছানোর সুবিধা থাকলে কাটার পরিমাণ ও পরিবেশনের পরিকল্পনা আগেই করা যায়।